২৫ মার্চ গণহত্যা দিবস

অনলাইন ডেস্ক:একাত্তরের ২৫ মার্চের কালরাতে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর বর্বরোচিত ও নৃশংস হত্যাকাণ্ডকে ‘গণহত্যা দিবস’ হিসেবে পালনের জন্য আজ শনিবার সংসদে সর্বসম্মতভাবে প্রস্তাব গৃহীত হয়েছে।

এ সংক্রান্ত আলোচনায় অংশ নিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, একাত্তরের গণহত্যার ঘটনা যারা ‍ভুলে যায়, তাদের এই দেশে থাকার কোনো অধিকার নেই। যুদ্ধাপরাধীদের নিয়ে যারা দহরম-মহরম করে, তাদের পাকিস্তানে চলে যাওয়া উচিত। তারা এই দেশে থাকলে দেশের মানুষের ভাগ্য সব সময় দুর্ভাগ্য পরিণত হবে।

২৫ মার্চকে গণহত্যা দিবস হিসেবে পালনের জন্য ১৪৭ বিধিতে প্রস্তাব উত্থাপন করেন জাসদের সাংসদ শিরীন আখতার। তিনি প্রস্তাব করেন—১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ কালরাত্রিতে বর্বর পাকিস্তানি সেনাবহিনীর গণহত্যাকে স্মরণ করে দিনটিকে ‘গণহত্যা দিবস’ ঘোষণা করা হোক এবং আন্তর্জাতিকভাবে এ দিবসের স্বীকৃতি আদায়ে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করা হোক।

প্রস্তাব ওঠার পরপরই সংসদ নেতা ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, শুধু ২৫ মার্চ নয়। যুদ্ধ চলাকালে এবং যুদ্ধের পরও গণহত্যা হয়েছিল। এই সংসদে অনেক নতুন সদস্য আছেন, যারা ৭১ এর সেই সব ভয়াল চিত্র দেখেননি। মাননীয় স্পিকারের অনুমতি নিয়ে আমি ওই সময়কার কিছু ছবি-ভিডিও চিত্র দেখাতে চাই।

স্পিকার অনুমতি দিলে ১৮ মিনিট ধরে পাকিস্তানির বাহিনীর নির্মমতার বিভিন্ন চিত্র ও ভিডিও দেখানো হয়। এ সময় পুরো অধিবেশন কক্ষে ছিল পিনপতন নীরবতা। চিত্র প্রদর্শনীর সময় সাংসদদের অনেককে আবেগাপ্লুত অবস্থায় দেখা যায়। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে একাধিকবার চোখ মুছতে দেখা গেছে।

সাধারণ আলোচনায় প্রধানমন্ত্রীসহ মোট ৫৬ জন বক্তব্য দেন।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, সারা বিশ্বের পত্র-পত্রিকায় এসেছে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী কীভাবে গণহত্যা করেছে। আমি নিজের চোখে সেই বিভীষিকা দেখেছি। বাংলাদেশের এমন কোনো গ্রাম নেই যেখানে গণহত্যার চিহ্ন নেই। হানাদার বাহিনী এসেছিল পাকিস্তান থেকে। এ দেশের পথঘাট তাদের চেনার কথা নয়। তাদের পথঘাট চিনিয়েছে আলবদর, রাজাকার, আল শামস আর জামায়াত-শিবির। এরাই ছিল পাকিস্তানিদের দোসর। যে গণহত্যা বাংলাদেশে হয়েছে তার জন্য পাকিস্তানি বাহিনী যতটা দায়ী, ততটাই দায়ী আল বদর, আল শামস, রাজাকাররা।

মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে বিতর্ক তোলা ব্যক্তিদের সমালোচনা করে শেখ হাসিনা বলেন, দেশে কিছু দালাল রয়েছে। এখনো তারা মিথ্যাচার করে যাচ্ছে। আমার নিজেরই লজ্জা হয়, এই লোকটাকে আমি অবসরে যাওয়ার সময় মেজর জেনারেল পদে প্রমোশন দিই। নাম জেড এ খান। তিনি তার বইয়ে লিখেছেন, বাংলাদেশের স্বাধীনতা নাকি ভারতের ‘র’য়ের (গোয়েন্দা সংস্থা) ষড়যন্ত্রে এসেছে। দেশের স্বাধীনতা না হলে কি এই লোক মেজর জেনারেল হতে পারত। তার মধ্যে যদি এতটুকু লজ্জা থাকত বা ঘৃণা থাকত এটা কি লিখতে পারত?

শেখ হাসিনা বলেন, ‘দুঃখ লাগে দেশে কিছু কুলাঙ্গার পয়দা হয়েছে। তারা পাকিস্তানিদের লাঠি-ঝাটা খেয়েও তাদের পদলেহন করবে। এত বড় গণহত্যা। ৩০ লাখ লোক মারা গেল। ইয়াহিয়া নিজেই তো বলেছে ৩০ লাখ লোক মেরে দিলে আর মেয়েদের রেপ করলেই বাঙালি ঠান্ডা হয়ে যাবে। কিন্তু বাঙালি ঠান্ডা হয়নি। বাঙাল যখন রুখে দাঁড়ায় তখন কেউ তাদের ঠান্ডা করতে পরে না। উল্টো ইয়াহিয়া খানকে উন্মাদ হয়ে মরতে হয়েছে।’

সংসদের গণহত্যা দিবসের প্রস্তাবটি গ্রহণের আহ্বান জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, এই প্রস্তাবটি সর্বসম্মতভাবে গ্রহণ করলে কলঙ্ক থেকে বাঙালকে মুক্তি দেওয়া হবে। গণহত্যার বীভৎস রূপ যারা দেখেছে তারা কখনো ভুলতে পারবে না। যারা দেখেনি তারা ভয়াবহতা বুঝতে পারবে না।

আলোচনায় জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী বিশেষ দূত এইচ এম এরশাদ বলেন, মন্ত্রিসভার সদস্যদের একটি অংশের বাধার কারণে তাঁর শাসনামলে প্রস্তাব এনেও বঙ্গবন্ধুকে জাতির পিতার স্বীকৃতি দিতে পারেননি। তিনি বলেন, কয়েকজনের বাধার কারণে প্রস্তাবটি পাস করতে পারেনি। এই দুঃখ নিয়ে আমাকে মরতে হবে।

মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিতে না পারাকে জীবনের জন্য সব থেকে দুঃখ বলে এরশাদ দাবি করেন। তিনি বলেন, পাকিস্তানিরা বাঙালি জাতিকে নিশ্চিহ্ন করতে চেয়েছিল। রক্তের বিনিময়ে স্বাধীনতা। এই রক্তকে অবমাননা করলে স্বাধীনতাকে অবমাননা করা হবে। বঙ্গবন্ধুকে অবমাননা করা হবে।

এরশাদ আরও বলেন, ৬৯ সালে আমি লেফটেন্যান্ট কর্নেল হই। ১৯৭০ সালের ২৯ ডিসেম্বর আমাকে করাচিতে বদলি করা হলো। মার্চে যুদ্ধ শুরু হলো। আমি মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করতে পারিনি। তার আগে আমি যখন ছুটিতে ছিলাম, তখন জেনারেল ওসমানী সাহেবকে ফোন করেছিলাম। তিনি বলেছিলেন, এখনো মুক্তিযুদ্ধ শুরু হয়নি। ইউ মাস্ট ফলো দি অর্ডার। আমার জীবনের সবচেয়ে বড় দুঃখ মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করতে না পারা।

আলোচনায় অংশ নিয়ে ১ ডিসেম্বরকে মুক্তিযোদ্ধা দিবস হিসেবে পালনের প্রস্তাব করে বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ বলেন, শহীদের সংখ্যা নিয়ে কোনো সংশয় নেই। এমনকি মাওলানা মওদুদীর ছেলেও জামায়াতের অফিশিয়াল প্রকাশনার উদ্ধৃতি দিয়ে বলেছেন, একাত্তরে পাকিস্তানি বাহিনীর হাতে বাংলাদেশে নিহতের সংখ্যা ৩৫ লাখ। এই সংখ্যা নিয়ে যারা প্রশ্ন তোলে তাদের ধিক্কার জানাই।

ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি ও বিমানমন্ত্রী রাশেদ খান মেনন বলেন, পাকিস্তানি বাহিনী একাত্তরে বেলুচিস্তানেও গণহত্যা চালিয়েছিল।
জাসদের সভাপতি হাসানুল হক ইনু বলেন, বাংলাদেশে আর কখনো যাতে স্বাধীনতা বিরোধীরা ক্ষমতায় আসতে না পারে, সে জন্য এই দিবস পালন করতে হবে।

আলোচনায় আরও অংশ নেন আওয়ামী লীগ দলীয় সাংসদ শেখ ফজলুল করিম সেলিম, মোহাম্মদ নাসিম, ফারুক খান, আবদুল মতিন খসরু, মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়া, শাজাহান খান, মহীউদ্দিন খান আলমগীর, আলী আশরাফ, কামরুল ইসলাম, আসাদুজ্জামান খান কামাল, আ ক ম মোজাম্মেল হক, ফজলে রাব্বী মিয়া, শওকত আলী, আ স ম ফিরোজ, দীপু মনি, শাহরিয়ার আলম, তারানা হালিম, জুনাইদ আহমেদ, বিরোধী দলীয় নেতা রওশন এরশাদ, জিয়াউদ্দিন আহমেদ বাবলু, ফখরুল ইমাম, কাজী ফিরোজ রশীদ, জাসদের মইনউদ্দীন খান বাদল, ওয়ার্কার্স পার্টির ফজলে হোসেন বাদশা প্রমুখ।

সাধারণ আলোচনা শেষে সংসদ নেতা শেখ হাসিনা ও বিরোধী দলীয় নেতা রওশন এরশাদ বক্তব্য দেন। এরপর স্পিকার সংসদ অধিবেশনের সমাপ্তি সম্পর্কিত রাষ্ট্রপতি ঘোষণা পাঠ করেন।

About The Author

Related posts

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *