সমস্যা ও সংকট সাংবাদিকদের পিছু ছারছে না

(মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলম প্রধান) : মিডিয়া নিয়ে তুষ্ট হতে পারছেন না নীতিবান সাংবাদিকরা। আদর্শ পেশা হিসেবে পরিচিত যে পেশা, সে পেশার সঙ্গে যুক্তরা চরম ঝুঁকি নিয়ে দায়িত্ব পালন করছেন। অন্যের সমস্যা নিয়ে যারা সদা কাজ করেন, ভাগ্যের ফেরে তারা নিজেই সংবাদ শিরোনাম হচ্ছেন।

সাংবাদিক দম্পতি সাগার-রুনির বিচার না হওয়ায় এবং প্রকৃত খুনিদের গ্রেফতারপূর্বক দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির আওতায় না আনায় এই পেশার ঝুঁকি বেড়ে গেছে- এ অভিমত অপরাধ বিশ্লেষকদের। দেশে বিচার পাওয়ার অধিকার সবার রয়েছে। এত আন্দোলনের পরও একটি সাংবাদিক দম্পতির হত্যার বিচার নিয়ে যে কালক্ষেপণ ও রহস্যময় আচরণ চলছে, তা ন্যায়বিচার প্রাপ্তির প্রতি মানুষের আস্থাহীনতার সৃষ্টি করছে বলে মনে করার যথেষ্ট কারণ রয়েছে।

মত প্রকাশের স্বাধীনতা সংবিধানে লিপিবদ্ধ আছে। সেটা বাস্তবে কতটুকু আছে, সেটা সংশ্লিষ্টরাই ভালো জানেন। সাময়িকের কথা বলে জনপ্রিয় বেশ কয়টি গণমাধ্যমকে কৌশলে বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। এতে পেশাদার সহস্রাধিক সাংবাদিক বেকার হয়ে পড়েন। পরিবার নিয়ে তারা কষ্টকর জীবন যাপন করছেন। দ্রব্যমূল্যের লাগামহীন ঊর্ধ্বগতি তাদের সমস্যাকে প্রকট করছে।

দায়িত্বশীলরা বারবার প্রতিশ্রুতি দেয়া সত্ত্বেও ভীতি সৃষ্টিকারী আইসিটি আইনটি এখনো কার্যকর৷ এমন একটি আইন যে দেশে কার্যকর থাকে, সেই দেশে বাকস্বাধীনতা বা মত প্রকাশের স্বাধীনতার অবস্থা কেমন, তা সহজেই ধারণা করা যায়৷ ‘বাকস্বাধীনতা নেই’ এই শব্দটি উচ্চারণ বা বলার কারণেও ৫৭ ধারার খপ্পরে পড়তে হতে পারে বলে অনেকের আশঙ্কা! এই শঙ্কা মাথায় নিয়ে কাজ করছেন সাংবাদিকরা।

আশঙ্কার বড় কারণ ৫৭ ধারা অনুযায়ী যে কোনো ব্যক্তি যদি পুলিশের কাছে গিয়ে অভিযোগ দায়ের করে যে, অমুক ব্যক্তি লিখে বা বলে আমার ‘মানহানি’ করেছে, অভিযোগ আমলে নিয়েই একজন এসআই সেই ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করতে পারবেন৷ কোনো তদন্ত ছাড়াই পুলিশ গ্রেপ্তার করতে পারবেন এবং তার সর্বোচ্চ ১৪ বছরের জেল হতে পারে৷ ব্যাপারটি সাংবাদিকতা পেশাকে চ্যালেঞ্জের মুখে ঠেলে দিয়েছে নিঃসন্দেহে।

আইসিটি আইনের ৫৭ ধারায় বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষকসহ বেশ কয়েকজনকে তিন থেকে সাত বছর জেল দেয়া হয়েছে৷ কজন সাংবাদিক জেল খেটে জামিনে মুক্ত আছেন। দৈনিক ইনকিলাবের তিন সিনিয়র সাংবাদিককে এই আইনে গ্রেফতার করা হয়। কোনো প্রকার পূর্ব সতর্ক ছাড়াই তাদের গ্রেফতার করে পুলিশ। দীর্ঘদিন কারাভোগ করেন তারা।

সবচেয়ে আশ্চর্যের ব্যাপার হলো, আজকাল আদালত থেকে নাকি এমনও বলে দেয়া হচ্ছে যে কার বক্তব্য গণমাধ্যমে যাবে না। বিষয়টিকে স্বাধীন মত প্রকাশের অন্তরায় হিসেবে মনে করছেন খোদ আইনজ্ঞরা। তাদের মতে, এতে ব্যক্তির মত প্রকাশের সাংবিধানিক স্বাধীনতা বাধাগ্রস্ত হয়। এ ক্ষেত্রে ব্যক্তির মত প্রকাশের অধিকারকে প্রতিষ্ঠাই অধিক যুক্তিযুক্ত বলে সংবিধান বিশেষজ্ঞদের অভিমত।

কদিন আগে বাংলাদেশে মত প্রকাশের স্বাধীনতা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দফতরের বার্ষিক প্রতিবেদনে যে চিত্র তুলে ধরা হয়েছে, তাতে অনেকের গা জ্বললেও পেশাদার সাংবাদিকদের কাছে তাতে অবাক হননি। মতপ্রকাশের স্বাধীনতা সঙ্কুচিত হওয়ার যে অপনজির চালু হয়ে গেছে, তাতে যারপরনাই চিন্তিত মুক্ত ও স্বাধীন গণমাধ্যমে বিশ্বাসী সাংবাদিকরা।

বর্তমান প্রেক্ষাপটে অনেক গণমাধ্যমে নিয়মিত বেতন-ভাতা দেয়া হচ্ছে না। যারাওবা দিত তারা গড়িমসি করতে শুরু করেছে। হাতেগোনা কয়েকটি প্রতিষ্ঠান ছাড়া বাকিরা আজও অষ্টম ওয়েজ বোর্ড কার্যকর করেনি। অবৈধ উপায়ে অর্থের বিনিময়ে ওইসব প্রতিষ্ঠান সার্টিফেকেট সংগ্রহ করেছে। আর সাংবাদিকদের একটি চিহ্নিত অংশ ওই সার্টিফিকেট দাতা হিসেবে বেশ নিন্দা কুড়াচ্ছে।

আলোচিত সমস্যা ও সংকট বলে দিচ্ছে গণমাধ্যম কর্মীরা ঘোর দুদিন পার করছেন। এক কেজি লবণ যখন ৪২ টাকা কেজি তখন অন্য পেশাদারদের বেতন-ভাতা ১২৩ শতাংশ বৃদ্ধি পেলেও সাংবাদিকরা বঞ্চিতের কাতারে। সময় ফেরিয়ে গেলেও তাদের ন্যায্য পাওনা নবম ওয়েজ বোর্ড গঠনে নানা রকম ছলছাতুরির আশ্রয় নেয়া হচ্ছে। এ অবস্থায় একটি প্রশ্নবিদ্ধ ওয়েজ বোর্ড গঠনের আশঙ্কা করছেন নীতিবান সাংবাদিক নেতারা।

অনৈতিক উপায়ে অর্থ-ভিত্তের পাহাড় গড়া চিহ্নিত মহলটি নিজেদের নোংরা অতীতকে ঢাকা দিতে মিডিয়ার প্রতি ঝুঁকছে। তাদের মিডিয়ায় কর্মরতদের মধ্যে শীর্ষ কজনকে হাত করে ৯৫ শতাংশকে নানাভাবে বঞ্চিত করা হচ্ছে। কর্পোরেট হাউজ নামে পরিচিত এসব গণমাধ্যমের বেশির ভাগ সংবাদ কর্মী বৈষ্যমের কারণে আত্মপীড়নে ভুগছেন। চাকরি চলে গেলেও তারা নিয়ম অনুযায়ী পাওনাদি পান না।

সব মিলিয়ে গণমাধ্যমে অস্থিরতা বিরাজ করছে বললে কমই বলা হবে। চাকরির অনিশ্চিয়তা, ঝুঁকি ও অস্থিরতা মিলিয়ে পেশা হিসেবে সাংবাদিকতা নতুন সংকটের মুখোমুখি। সাংবাদিকতা পেশাকে ঝুঁকিহীন ও অস্থিরতা মুক্ত করতে দায়িত্বশীল পর্যায় থেকে সময়োপযোগী উদ্যোগ গ্রহণ জরুরি। আর সে উদ্যোগ যত দ্রুত গ্রহণ করা হবে, ততই পেশাদার হিসেবে সাংবাদিকরা ঝুঁকিমুক্ত হয়ে দেশবাসীর সেবায় আত্মনিয়োগে আরো যত্নবান হতে পারবেন।

লেখক : সাধারণ সম্পাদক- ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়ন

About The Author

Related posts

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *