বিএনপিতে নির্বাচনের প্রস্তুতি

অনলাইন ডেস্ক:আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে ঘিরেই বিএনপিতে সর্বাত্মক প্রস্তÍুতি শুরু হয়েছে। নির্বাচনের মাধ্যমে আগামীতে সরকার গঠনের লক্ষে দলটির নীতিনির্ধারকরা তাদের কর্মপদ্ধতি চূড়ান্ত করেছেন। সে অনুযায়ী চলছে দলের যাতীয় কর্মকান্ড। নির্বাচনী ইশতেহার তৈরি, প্রচারণার কৌশল নির্ধারণ এবং প্রার্থী বাছাই প্রক্রিয়া চলছে। তবে অবাধ, সুষ্ঠু নির্বাচনের পরিবেশ ছাড়া বিএনপি নির্বাচনে যাবে না। বিএনপির একাধিক নীতি-নির্ধারক পর্যায়ের নেতার সাথে কথা বলে এমনটি জানা গেছে। বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট খন্দকার মাহবুব হোসেন বলেছেন, দলীয় সরকারের অধীনে জাতীয় নির্বাচন সুষ্ঠু হবে না। নির্বাচনকালীন সহায়ক সরকার হলে বিএনপি নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে প্রস্তুত। বিএনপির নেতারা মনে করেন বর্তমান সরকারের অনিয়ম-দুর্নীতি ও জুলুম-নির্যাতনের কারণে জনগণ অতিষ্ঠ। তাদের জনসমর্থন এখন একেবারে তলানিতে বলা যায়। এ অবস্থায় অবাধ, সুষ্ঠু নির্বাচন হলে সরকারের ভরাডুবি নিশ্চিত। তাই অবাধ ও নিরপেক্ষ একটি নির্বাচন আদায় করাই তাদের মূল লক্ষ্য। নির্বাচন এবং নির্বাচনকালীন সহায়ক সরকারের আন্দোলনের সার্বিক প্রস্তুতির বিষয়টি ইতোমধ্যে বিএনপি তৃণমূল পর্যায়ে পৌঁছে দিয়েছে। জেলা পর্যায় থেকে একেবারে ওয়ার্ড পর্যায়ের নেতাকর্মীদের মধ্যে এখন নির্বাচনের প্রস্তুতি শুরু হয়েছে। এ বিষয়ে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন ইনকিলাবকে বলেন, একটি গণতান্ত্রিক দল হিসেবে নির্বাচনের জন্য আমরা সব সময়ই প্রস্তুত। দল পুনর্গঠনের পাশাপাশি নির্বাচনের যাবতীয় প্রস্তুতিও চলছে। তবে নির্বাচন যাতে অবাধ, সুষ্ঠু হয় সে জন্য উপযুক্ত পরিবেশ প্রয়োজন। আর সে পরিবেশের চন্য একটি দলনিরপেক্ষ সরকার প্রয়োজন। দলীয় সরকারের অধীনে কোনো সুষ্ঠু নির্বাচন সম্ভব নয় এটা প্রমাণিত। তাই বিএনপি তথা ২০ দলীয় জোট একটি দল নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে সুষ্ঠু নির্বাচন হবে এমন পরিবেশ দেখেই নির্বাচনে যাবে। আর সুষ্ঠু নিরপেক্ষ নির্বাচন হলে বিএনপি আগামীতে অবশ্যই সরকার গঠন করবে। দলের অপর স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. অব্দুল মঈন খান বলেন, আওয়ামী লীগ প্রধান শেখ হাসিনাসহ দলের অন্যান্য অনেক নেতাই বলছেন তারা আগামীতে আর প্রশ্নবিদ্ধ নির্বাচন চান না। তাদের এমন বক্তব্যে স্পষ্টত প্রমাণ হয় যে  বিগত ৫ জানুয়ারির নির্বাচন ছিল প্রশ্নবিদ্ধ। আর দলীয় সরকারের অধীনে অন্যান্য নির্বাচনও ব্যাপক প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে। আগামী নির্বাচন অবাধ ও সুষ্ঠু করতে হলে নির্বাচনকালীন নিরপেক্ষ সরকারের প্রয়োজন। সে সরকারের রূপরেখা সকল দলের সাথে আলোচনার মাধ্যমে চূড়ান্ত করে আগামী নির্বাচন সকলের কাছে গ্রহণযোগ্য করতে ক্ষমতাসীনদেরই উদ্যোগ নিতে হবে। বিএনপি নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোট নিরপেক্ষ সরকারের দাবি আদায় করেই নির্বাচনে অংশগ্রহণ করবে এবং জনগণের রায় নিয়ে বিজয়ী হবে।
নির্বাচনের প্রস্তুতি হিসেবে বিএনপি ইতোমধ্যে বেশ কয়েকটি কমিটি গঠন করে কাজ শুরু করেছে। এর মধ্যে রয়েছে নির্বাচনকালীন সরকারের রূপরেখা তৈরির বিশেষজ্ঞ কমিটি। ২০ দলীয় জোটের বাইরে অন্যান্য রাজনৈতিক দলের সাথে যোগাযোগ রক্ষা করার কমিটি। সাংগঠনিক পুনর্গঠন কমিটি। নাগরিক সমাজ ও গণমাধ্যমের সাথে যোগাযোগ রক্ষা কমিটি। আন্তর্জাতিক যোগাযোগ ও সম্পর্ক উন্নয়ন কমিটি। এছাড়া সাংগঠনিক বিভাগের সার্বিক রিপোর্ট প্রদান কমিটি।
দলীয় সূত্র মতে, বিএনপি নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোটের বর্তমান মূল দাবি নির্বাচনকালীন সরকারের রূপরেখা প্রায় শেষ পর্যায়ে রয়েছে। চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়ার নির্দেশে গঠিত বিশেষজ্ঞ কমিটি বিশ্বের বিভিন্ন উন্নত গণতান্ত্রিক দেশের নির্বাচন প্রক্রিয়া পর্যালোচনা করে ‘নির্বাচনকালীন সরকারের’ রূপরেখা তৈরি করছেন। চলতি মাসের মধ্যে বিশেষজ্ঞ কমিটি তাদের তৈরি রূপরেখা বিএনপি চেয়ারপার্সনের কাছে হস্তান্তর করবেন। তিনি দলের নীতি-নির্ধারক ও জোটের নেতাদের সাথে এ নিয়ে আলোচনা-পর্যালোচনা করে তা চূড়ান্ত করবেন। এরপর সরকারের কাছে এই রূপরেখা পেশ করা হবে এবং একই সাথে সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে তা দেশবাসীর কাছে প্রকাশ করা হবে।
সাংগঠনিক পুনর্গঠন কমিটি ইতোমধ্যে সারাদেশে জেলা পর্যায়ের কমিটি গঠনের কাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে নিয়ে এসেছে। বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের তত্ত¡াবধানে দলের ভাইস চেয়ারম্যান মোহাম্মদ শাহজাহানের নেতৃত্বে এ কমিটি কাজ করছে। জেলার বিভিন্ন পর্যায়ের নেতৃবৃন্দের সাথে আলোচনা করে একটি খসড়া কমিটি তৈরি করে চেয়ারপার্সনের কাছে তা পেশ করা হচ্ছে। চেয়ারপার্সন সিনিয়র নেতাদের সাথে পরামর্শ করে প্রতিটি জেলা কমিটি চূড়ান্ত করছেন। এ বিষয়ে দল পুনর্গঠনে দায়িত্বপ্রাপ্ত দলের ভাইস চেয়ারম্যান মোহাম্মদ শাহজাহান বলেন, নানান প্রতিক‚ল পরিস্থিতির মধ্যে আমরা দল পুনর্গঠনের কাজ করছি। নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে শত শত মামলা, রয়েছে সরকারের প্রতিবন্ধকতা। তারপরও আমরা কাজ করে যাচ্ছি। খুব শিগগিরই আমাদের দল পুনর্গঠন প্রক্রিয়া সম্পন্ন হবে। এ পুনর্গঠন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে দলের ঐক্য ও সংহতি আরও দৃঢ় হচ্ছে। এছাড়া তৃণমূল পর্যায়ে দলের সাংগঠনিক অবস্থা আরও শক্তিশালী হচ্ছে বলে তিনি মনে করেন।
আগামী নির্বাচনকে সামনে রেখে ২০ দলীয় জোটের বাইরে থাকা বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সাথে যোগাযোগ রক্ষা করছেন দলের তিনজন সিনিয়র নেতা। নির্বাচনকালীন দলনিরপেক্ষ সরকারের দাবি নিয়ে তারা এসব রাজনৈতিক দলের সাথে আলোচনা করছেন। নির্বাচনকালীন সরকারের দাবি নিয়ে জোরালো আন্দোলন গড়ে তোলার লক্ষে তারা কাজ করছেন। এ ছাড়া নির্বাচনকালীন সরকারের দাবি আদায়ের লক্ষে দেশব্যাপী জনমত গড়ে তুলতে নাগরিক সমাজ এবং গণমাধ্যমের সাথে পর্যালোচনার জন্যও পৃথক কমিটি গঠিত হয়েছে। এসব কমিটি সমাজের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের সাথে যোগাযোগ করে দাবি তুলে ধরে জনমত তৈরি করবে। একই সাথে জনগণের মতামতের ভিত্তিতে নির্বাচনী ইশতেহার তৈরি এবং প্রচারণার কৌশলও নির্ধারণ করবে।
আগামী নির্বাচন নিয়ে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে যোগাযোগ রক্ষা ও সম্পর্ক উন্নয়নের লক্ষে পৃথক তিনটি টিম কাজ করছে। আমেরিকা, চীন এবং ভারতের সাথে আলাদাভাবে আলোচনার মাধ্যমে নির্বাচনকালীন নিরপেক্ষ সরকারের দাবি আদায় এ টিমের মূল লক্ষ্য। এ ছাড়াও বিএনপি প্রতিটি বিভাগের সাংগঠনিক সম্পাদককে সদস্য সচিব এবং কেন্দ্রীয় কমিটির একজন সিনিয়র নেতাকে আহ্বায়ক করে কমিটি গঠন করছে। এ কমিটি প্রতিটি বিভাগের সাংগঠনিক রিপোর্ট এবং নির্বাচনের বিষয় সার্বিক তত্ত¡াবধান করে এ বিষয় দলের চেয়ারপার্সনকে অবিহিত করবে।

About The Author

Related posts

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *