বগুড়ার মহাস্থানে অমুল্য প্রত্ন সামগ্রী হস্তান্তর করে ইতিহাস গড়লেন অধ্যাপক মান্নান

মহাস্থান প্রতিনিধিঃ বগুড়ার মহাস্থানে অমুল্য প্রত্ন সামগ্রী হস্তান্তর করে ইতিহাস গড়লেন অধ্যাপক আব্দুল মান্নান।
আমাদের প্রতিনিধি নুরনবী রহমান জানায়ঃ দীর্ঘ ৪২ বছর ধরে মাঠ-ঘাট আর গ্রাম-গঞ্জে ঘুরে সংগ্রহ ও সংরক্ষিত রাখা অমূল্য প্রতœতাত্ত্বিক বিপুল পরিমান রতœ আনুষ্ঠানিক ভাবে শনিবার বিকেলে তিনি বগুড়ার ঐতিহাসিক মহাস্থান যাদুঘর চত্বরে প্রতœতাত্ত্বিক অধিদপ্তরের মহাপরিচালক আলতাফ হোসেনের কাছে হস্তান্তর করেন। বগুড়ার ঐতিহাসিক
মহাস্থানগড় তথা প্রন্ড্রবর্ধনগড়ের কোলঘেঁষা গ্রামে জন্ম ও ধীরে ধীরে বেড়ে ওঠা আব্দুল মান্নান শৈশব জিবন থেকেই পুরাকীর্তি প্রেমি ছিলেন। এক সময় তিনি ইতিহাস-ঐতিহ্য নিয়ে লেখাপড়া শুরু করেন। তারপরও থেমে থাকেনি তার প্রতœসামগ্রী রতœ সংগ্রহ। ‘ইতিকথা পুর্নবর্ধন’ নামের ইতিহাস স্থাপন করতে গিয়ে চষে বেড়ান পুরো মহাস্থানগড় ও তার পার্শ্ববর্তী প্রন্ড্রনগর এলাকা। তৎকালীন থেকেই তার নজরে আসে অনেক প্রতœ রতœ নানা স্থানে নানা জনের কাছে অনাদরে পড়ে থাকা এসব সম্পদ। তিনি সেই গ্রন্থের তথ্য-উপাত্ত করতে প্রতœতাত্ত্বিক বস্তু সংগ্রহ করতে যাত্রা শুরু করেন। একটানা ১৯৭৫ সাল থেকে তার এই সংগ্রহের নেশা শুরু। টানা ৪২ বছর ধরে সংগ্রহ করেন ও রতœ সযতেœ নিজ হেফাজতে রাখেন। পুঁতির দানা থেকে প্রাচীন আমলের পণ্য বিনিময়ে ব্যবহৃত কড়ি, মৃৎ সামগ্রী থেকে শুরু করে তামা, পিতল ও ব্রঞ্চের তৈজসপত্র; খাট-পালঙ্ক, দরজা-জানালা এসব কোটি কোটি টাকার প্রতœ রতœ সংগ্রহ করে তিনি তাক লাগিয়ে দেন দেশবাসী কে। এসব সংগ্রহের কারন হিসাবে এক সময় তিনি ব্যক্তিগত উদ্যোগে একটি জাদুঘর করার ইচ্ছা প্রকাশ করেন। এজন্য অধ্যাপক আব্দুল মান্নান পরামর্শ নিতে যোগাযোগ করেন প্রতœতাত্ত্বিক অধিদপ্তরে। কিন্তু আইনী ভাবে ব্যক্তিগত যাদুঘর তৈরীর অনুমোদন সম্ভব নয় বলে তাকে জানানো হয়। পরে আইনী জটিলতা হতে পারে এমনটা ভেবে আইনকে শ্রদ্ধা দেখিয়ে তিনি সেচ্ছায় তার সমগ্রী সংগৃহীত অমূল্য প্রতœ সম্পদের ভান্ডার প্রতœতাত্ত্বিক অধিদপ্তর তথা সরকারের নিকট হস্তান্তরের উদ্যোগ নেন। এ ধারাবাহিকতা বজায় রেখে শনিবার ঐতিহাসিক মহাস্থান যাদুঘরে অধ্যাপক আব্দুল মান্নান প্রতœতাত্ত্বিক অধিদপ্তর এর কাছে এসব হস্তান্তর করেন। এসময় প্রতœতাত্ত্বিক এর মহাপরিচালক আলতাফ হোসেন তিনি নিজে বগুড়ার মহাস্থানে এসে ওই রতœ গুলো তার কাছ থেকে আনুষ্ঠানিক ভাবে গ্রহণ করেন।
অধ্যাপক আব্দুল মান্নান তার সংগৃহীত প্রতœভান্ডার থেকে যেসব পুরাকীর্তি সামগ্রী হস্তান্তর করলেন, তার মধ্যে পোড়া মাটির অলকৃত ইট, পোড়া মাটির ঢাকনা, ঢাকনাসহ পাতিল ও বাটি, লাল ও কালো রঙের কলসি, ব্রোঞ্জের বাটি, খাড়–য়া, বালা, লকেট, গলার হার, চুলের কাঁটা, কোমড়ের বিছা, চিনা মাটির থালা, আলাদিনের প্রদীপ সাদৃশ্য পাত্র, লোহার মসলা বাটার পাত্র, অলঙ্কার সংরক্ষনের জন্য ছোট বাক্স, কাঁচের মূর্তি, পাখির প্রতিকৃতির মূর্তি, হুক্কা, ছোট হাস্যবদন বুদ্ধ মূর্তি, সাদা পাথরের বটিকা, পিতলের বাটি, থালা ও কুপি, ঘটি, জলদানি, নলযুক্ত পোড়া মাটির কলস, পিতলের রিকশা, পানদানি, আতরদানি, সুরমাদানি, রূপার মুদ্রা, তামার মুদ্রা, কড়ির মালা, হাড়ের তৈরি নরমুণ্ড মালা, কাঠের মালা, সোনার প্রলেপযুক্ত কয়েন, তামার ফরসি লিপি, পোড়া মাটির সিলিং(মোহর), নানা রঙের বিটিং(পুঁতি), প্রাচীন আমলের দরজা(কপাট) খাট(পালঙ্ক)সহ ইত্যাদি। প্রায় ২হাজার ছয়শতাধিক প্রতœসামগ্রী তিনি হস্তান্তর করেন।
অধ্যাপক আব্দুল মান্নান জানান, প্রতœবস্তুর প্রতি ভালোবাসা থেকে তিনি এসব রতœ সংগ্রহ করেছিলেন। ইচ্ছা ছিল মানুষের জন্য প্রদর্শনের ব্যবস্থা করা। যেন মানুষের মধ্যে ইতিহাস জাগ্রত হয়। সে ইচ্ছা থেকে তিনি প্রতœতাত্ত্বিক অধিদপ্তরকে সেগুলো হস্তান্তর করেন। প্রতœতাত্ত্বিক অধিদপ্তরও মহাস্থান জাদুঘরে তা প্রদর্শনের মাধ্যমে তার সেই ইচ্ছাকে বাস্তবায়ন করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।
প্রতœতাত্ত্বিক অধিদপ্তরের আঞ্চলিক পরিচালক নাহিদ সুলতানা বলেন, অধ্যাপক আব্দুল মান্নান দীর্ঘদিন প্রচেষ্টা চালিয়ে খ্রিষ্টপূর্ব দ্বিতীয়াব্দ থেকে শুরু করে ব্রিটিশ শাসনামল পর্যন্ত নানা সামগ্রী সংগ্রহ করেছেন। তার সংগৃহীত অধিকাংশ রতœ অত্যস্ত মূল্যবান এবং ইতিহাসের অংশ। একারনে তার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি সেসব জনগণের মাঝে প্রদর্শনের জন্য সরকারের কাছে জমা দিতে সম্মত প্রকাশ করেন।
প্রতœতাত্ত্বিক অধিদপ্তরের মহাপরিচালক আলতাফ হোসেন হস্তান্তর অনুষ্ঠানে বলেন, মহাস্থান তথা প্রাচীন এই পুর্ণনগরী অত্যন্ত সমৃদ্ধ এলাকা। এই অঞ্চলের বিভিন্ন জায়গা থেকে অধ্যাপক আব্দুল মান্নান ব্যক্তিগত উদ্যোগে যেসব সামগ্রী সংগ্রহ করেছেন তা সময়সাপেক্ষ বিষয়। ওইসব সামগ্রী তিনি সরকারকে হস্তান্তর করে প্রতœতাত্ত্বিক বিভাগকে সমৃদ্ধ করেছেন এবং প্রত্যেকটি সামগ্রীর নিচে তার সৌজন্যে পাওয়ার বিষয়টিও উল্লেখ থাকবে। হস্তান্তর অনুষ্ঠানে অন্যান্যের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন, প্রতœতাত্ত্বিক অধিদপ্তরের আঞ্চলিক পরিচালক নাহিদ সুলতানা, মহাস্থান জাদুঘরের কাস্টডিয়ান মজিবর রহমান, অধ্যাপক আব্দুল মান্নান, বগুড়া লেখক চক্রের সভাপতি ইসলাম রফিক, কবি শিবলী মোকতাদির, বগুড়া সাংবাদিক ইউনিয়নের(বিইউজে) সাধারণ সম্পাদক জে এম রউফ প্রমুখ।

About The Author

Related posts

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *