নৌকা মানুষকে রক্ষা করে

মহিউদ্দিন মুরাদ, লক্ষ্মীপুর থেকে ॥ প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা আগামী নির্বাচনসহ সব নির্বাচনে নৌকা মার্কায় ভোট দিয়ে আওয়ামী লীগকে জয়যুক্ত করার জন্য দেশবাসীর প্রতি উদাত্ত আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি বলেন, নৌকা, নূহ নবীর কিস্তি। বিপদে নৌকা মানুষকে রক্ষা করে। জনগণ নৌকায় ভোট দিয়ে সত্তরের নির্বাচনে আওয়ামী লীগকে জয়যুক্ত করেছে বলেই আমরা স্বাধীনতা পেয়েছি। আপনারা ভোট দিয়েছেন বলেই দেশের উন্নয়ন করতে পেরেছি। আর আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসলেই দেশের উন্নয়ন হয়। আমরা মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বাংলাদেশ গড়ে তুলব। বাংলাদেশকে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় উন্নত করতে চাই, শান্তি নিরাপত্তা আনতে চাই। আওয়ামী লীগের কাছে কখনও চাইতে হয় না, এ ভরসাটা রাখবেন।

প্রায় ২০ বছর পর সফরে এসে মঙ্গলবার বিকেলে লক্ষ্মীপুর জেলা স্টেডিয়ামে আওয়ামী লীগ আয়োজিত বিশাল জনসভায় বক্তব্য রাখতে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী বিএনপি-জামায়াত জোটের কঠোর সমালোচনা করে বলেন, আমাদের লক্ষ্যই হলো দেশের উন্নয়ন করা। আর বিএনপি ক্ষমতায় আসা মানেই দুর্নীতি, লুটপাট ও জঙ্গীবাদ সৃষ্টি করা। তারা ক্ষমতায় আসলে জনগণের নাভিশ্বাস উঠে। কারণ তারা দেশে ত্রাসের রাজনীতি করে। ক্ষমতায় গিয়ে তারা দুর্নীতি ও লুট করে। আর বিরোধী দলে গিয়ে মানুষ হত্যা করে। ২০১৩ সালে নির্বাচন ঠেকানোর নামে জ্বালাও-পোড়াও করেছে। বিএনপি চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়া গুলশানের কার্যালয়ে বসে ও তার এক কুলাঙ্গার ছেলে বিদেশে বসে হুকুম দিয়েছে, আর তাদের ক্যাডার বাহিনী সাধারণ মানুষের ওপর অত্যাচার, হত্যা ও নির্যাতন করেছে।

তিনি বলেন, বিএনপি দেশের উন্নয়ন চায় না। নিজের ক্ষমতা জন্য দেশের মানুষকে হত্যা করেছে। আন্দোলনের ২০১৫ সালে ৯৩ দিন পর্যন্ত মানুষকে গৃহবন্দী করে রেখেছিল। ২৭১ জন মানুষকে আগুনে পুড়িয়ে হত্যা করেছে। ১১শ’ ৮০ জন মানুষকে বোমা মেরে আহত করেছে। দুই হাজার ৯৩টি বাস-ট্রাক আগুনে পুড়েছে। এছাড়া ৭০টি সরকারী অফিসে আগুন লাগিয়েছে। আরও আগুন লাগিয়েছে লঞ্চসহ অন্যান্য সরকারী-বেসরকারী অবকাঠামোতে। কিন্তু জনগণের প্রতিরোধের মুখে তাদের সেই আন্দোলন ব্যর্থ হয়ে গেছে। তিনি বলেন, বিএনপি-জামায়াত ক্ষমতায় থাকাকালে ভারতের কাছ থেকে এক ফোঁটা পানিও আনতে পারেনি। তারা কোন স্থল চুক্তি করতে পারেনি, শান্তি চুক্তি করেনি। আমরা ক্ষমতায় এসে সব কিছু করেছি।

তিনি বলেন, বিএনপি ধর্মে বিশ্বাস করে না। ২০১৫ সালে আন্দোলনের নামে শত শত কোরান শরীফ আগুনে পুড়িয়েছে, মসজিদে আগুন দিয়েছে। বগুড়ায় মসজিদের কোরান তেলওয়াতকালে এক কৃষক লীগ নেতাকে কুপিয়ে খুন করেছে। যারা এ রকম করে তারা কিসের ধর্মে বিশ্বাস করে? নিরীহ মানুষকে যারা হত্যা করে তারা জান্নাতে নয়, দোযখে যায়। উন্নয়নের অঙ্গীকার করে লক্ষ্মীপুরবাসীর কাছে দোয়া, ভালবাসা ও নৌকায় ভোট চেয়ে শেখ হাসিনা বলেন, আসুন আমরা সবাই মিলে দেশকে গড়ে তুলি। আমার ব্যক্তিগত কোন চাওয়া-পাওয়া নেই। আমি তো সব হারিয়েছি। বাংলাদেশে এসেছি দেশের মানুষের ভাগ্যের উন্নয়নের জন্য কাজ করতে। আামি বাবার মতো, আমার পরিবারের মতো, আপনাদের কল্যাণে নিজের জীবন বিলিয়ে দেব। এ সময় প্রধানমন্ত্রী বলেন, ভোট দেবেন তো? এ সময় জনসভায় উপস্থিত লাখো জনতা দু’হাত তুলে এবং সেøাগান দিয়ে ভোট দেয়ার অঙ্গীকার করেন।

‘বিএনপির ঘাঁটি’ হিসেবে পরিচিত লক্ষ্মীপুরে প্রায় ২০ বছর পর সফরে এসে প্রধানমন্ত্রী জনসভায় ভাষণ প্রদান ছাড়াও ১০টি উন্নয়ন প্রকল্প এবং ১৭টি উন্নয়ন প্রকল্পের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন। লক্ষ্মীপুর জেলা আওয়ামী লীগ সভাপতি গোলাম ফারুক পিংকুর সভাপতিত্বে এবং সাধারণ সম্পাদক এ্যাডভোকেট নুরউদ্দিন চৌধুরী নয়নের সঞ্চালনায় জনসভায় আরও বক্তব্য রাখেন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের, চট্টগ্রাম বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদক একেএম এনামুল হক শামীম, ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী আরিফ খান জয়, যুব ও ক্রীড়া বিষয়ক সম্পাদক হারুনুর রশিদ, মহিলা সমাজ কল্যাণ বিষয়ক সম্পাদক ফরিদুন্নাহার লাইলী, স্থানীয় সংসদ সদস্য একেএম শাহজাহান কামাল, আবদুল্লাহ আল মামুন এমপি, বাংলাদেশ তরিকত ফেডারেশন মহাসচিব এম এ আউয়াল এমপি, জেলা জাতীয় পার্টির সভাপতি মোহাম্মদ নোমান এমপি, এ্যাডভোকেট নূরজাহান বেগম মুক্তা এমপি, পৌর মেয়র আবু তাহের, প্রধানমন্ত্রীর একান্ত সচিব এ্যাডভোকেট সাইফুজ্জামান শিখর, শহিদ ইসলাম পাপুল, মোঃ শাহজাহান, অধ্যাপক আব্দুল ওয়াহেদ, আনোয়ার খান, আবুল কাসেম, অধ্যাপক মামুনুর রশিদ, যুবলীগ নেতা ও সদর উপজেলা চেয়ারম্যান একেএম সালাউদ্দিন টিপু, ছাত্রলীগ নেতা রাকিব হোসেন লোটাস প্রমুখ। এর আগে স্থানীয় নেতৃবৃন্দ জেলা পর্যায়ে বিএনপি জামায়াত সরকারের আমলে তাদের ওপর অত্যাচার নির্যাতনের চিত্র তুলে বক্তব্য রাখেন। একই সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর কাছে জেলার বিভিন্ন দাবি দাওয়া তুলে ধরেন।

প্রধানমন্ত্রী দুপুর দেড়টায় হেলিকপ্টার করে লক্ষ্মীপুরে নামেন। সেখান থেকে তিনি সার্কিট হাউসে জোহরের নামজ শেষ করে ও দুপুরের খাবার খেয়ে জনসভায় যান। ২টা ৫০ মিনিটে স্টেডিয়ামে নির্মিত নৌকা আকৃতির বিশাল মঞ্চে উপস্থিত হন প্রধানমন্ত্রী। প্রধানমন্ত্রী আসার আগেই পুরো স্টেডিয়াম ছিল কানায় কানায় পরিপূর্ণ। স্টেডিয়ামে স্থান সংকুলান না হওয়ায় তার চতুর্দিকে প্রায় এক বর্গকিলোমিটার এলাকা লোকে-লোকারণ্য হয়ে পড়ে। এক পর্যায়ে বিশাল এ জনসভাটি রীতিমতো জনসমুদ্রে রূপ নেয়। জনসভায় বক্তব্য শেষে প্রধানমন্ত্রী হেলিকপ্টার যোগে ঢাকায় ফিরে যান। প্রধানমন্ত্রী স্থানীয় সমস্যার ব্যাপারে মেঘনার ভয়াবহ ভাঙ্গনের কবলে হাজার হাজার গৃহহারা মানুষকে বিনামূল্যে ঘর করে দেয়ার প্রতিশ্রুতি দেন। একই সঙ্গে ভূমিহীন প্রতিটি পরিবার জমি দেয়ার আশ্বাস দেন। প্রতিটি ইউনিয়ন থেকে উপজেলা এবং প্রতিটি ওয়ার্ডের কাদামুক্ত সড়ক নির্মাণের প্রতিশ্রুতি দেন।

প্রধানমন্ত্রী এলাকার পেশাজীবী, সাংবাদিক, ধর্মীয় নেতাদের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, আপনারা নিজ নিজ এলাকার সব ছেলে মেয়ের খোঁজ রাখবেন। তারা যেন জঙ্গীবাদের পথে না যায়। কারণ ইসলাম শান্তির ধর্ম। ইসলাম কোন মানুষকে হত্যা করতে বলেনি। ভুল বুঝিয়ে ছাত্রদের জঙ্গীবাদের দিকে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। আমার প্রশ্ন, এ পর্যন্ত কতজন জঙ্গী বেহেশতে গেছে? তারা কী বেহেশতে গিয়ে খবর পাঠিয়েছে? তিনি বলেন, ইসলাম শান্তির ধর্ম। ইসলামে জঙ্গীবাদের স্থান নেই।

তিনি বলেন, ইসলামের উন্নয়নের আমরা প্রতিটি জেলা ও উপজেলায় একটি মসজিদ ও ইসলামী কালচারাল সেন্টার প্রতিষ্ঠা করব। আমরা একদিন দেশের সব মানুষকে বিনা পয়সায় ঘরবাড়ি করে দেব। আমরাই দেশে বিনা পয়সায় বই বিতরণ করছি। আমরা দেশের জন্য, দেশের মানুষের জন্য কাজ করি। আমরাই বর্গা চাষীদের বিনা সুদে ঋণ দেয়া শুরু করি। ২০ লাখ মাকে মোবাইল ফোন দিয়েছি। উপবৃত্তির টাকা যাবে এসব মোবাইল ফোনে।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, অতীতে যারা ক্ষমতায় ছিল তাদের কেউ লক্ষ্মীপুরের উন্নয়ন করেনি। বিএনপি লক্ষ্মীপুরের জন্য কিছুই করেনি। আমি আজ আপনাদের জন্য উপহার নিয়ে এসেছি। এ সময় প্রধানমন্ত্রী উদ্বোধন ও ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করা প্রকল্পসমূহের তালিকা পড়ে শোনান। এছাড়া লক্ষ্মীপুরের উন্নয়নের জন্য যা যা করার সবই করবেন বলেও আশ্বাস দেন। প্রধানমন্ত্রী তাঁর বক্তব্যে আওয়ামী লীগ সরকারের উন্নয়নের বিবরণ তুলে ধরার পাশাপাশি বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের আমলের দুর্নীতি, অনিয়ম ও সন্ত্রাসের বর্ণনা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, এই লক্ষ্মীপুরে তাঁর দলের ৩৩ নেতাকর্মীকে বিএনপি-জামায়াত নির্মমভাবে হত্যা করেছে। আহত হয়েছে দু’শতাধিক। জোট সরকারের সময় আওয়ামী লীগের কোন নেতাকর্মী ঘর থাকতে পারেনি। এখানে বিএনপির নির্যাতন থেকে মুক্তিযোদ্ধারাও বাঁচতে পারেনি।

আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের আঞ্চলিক ভাষায় কথা বলে এলাকার মানুষকে উন্নয়নের অগ্রগতির কথা জানতে চান। তিনি বলেন, বিএনপি এখন একটি নালিশী দলে পরিণত হয়েছে। বিএনপি আগামী নির্বাচনকে ভয় পাচ্ছে। তাই বিভিন্ন অজুহাত তুলে জনগণের কাছে সরকারের বিরুদ্ধে উন্নয়নের ধারাকে ম্লান করার জন্য শুধু নালিশ করে যাচ্ছে। তাই তিনি বিএনপিকে বাংলাদেশ নালিশ পার্টি বলে আখ্যায়িত করেন। তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী তাঁকে নির্দেশ দিয়েছেন, এলাকার সকল সড়কের উন্নয়ন করার জন্য। তাই তিনিও তাঁর দফতরের কর্মকর্তা প্রকৌশলীদের নির্দেশ দিয়েছেন।

২৭টি প্রকল্পের উদ্বোধন ও ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন ॥ জনসভায় উপস্থিত হয়ে প্রধানমন্ত্রী লক্ষ্মীপুরের উন্নয়নে ১০টি প্রকল্পের উদ্বোধন ও ১৭টি প্রকল্পের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন। এগুলোর মধ্যে রয়েছে- লক্ষ্মীপুর মজুচৌধুরীহাট নৌবন্দর, লক্ষ্মীপুর রামগতি ও কমলনগর মেঘনা নদীর তীর সংরক্ষণ প্রকল্প, প্রায় ২৬ কোটি টাকা ব্যয়ে ৯তলা বিশিষ্ট নবনির্মিত লক্ষ্মীপুর চীফ জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালত ভবন, ১৮ কোটি ৫৬ লাখ টাকা ব্যয়ে নির্মিত লক্ষ্মীপুর যুব প্রশিক্ষণ কেন্দ্র, সদর উপজেলা পরিষদ ভবন, উপজেলা পরিষদ অডিটরিয়াম ভবন, কমলনগর উপজেলা পরিষদ ভবন ও অডিটরিয়াম, লক্ষ্মীপুর পৌর আইডিয়াল কলেজ ভবন, মোহাম্মদীয়া বাজার পুলিশ তদন্ত কেন্দ্র ভবন নির্মাণ ও কমলনগর উপজেলা প্রাণিসম্পদ দফতর ও প্রাণী হাসপাতাল। এ ছাড়া ১০০ শয্যা বিশিষ্ট লক্ষ্মীপুর সদর হাসপাতালকে ২৫০ শয্যা হাসপাতালে উন্নীতকরণ, মজুচৌধুরীর হাটে প্রশাসনিক ভবন ও নাবিক নিবাস, সদর পুলিশ ফাঁড়ির অফিসার্স মেস, আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিস ভবন, খাদ্য গোডাউনের নতুন গোডাউন নির্মাণ, রামগঞ্জে ১৩২/১৩৩ কেভি বৈদ্যুতিক গ্রিডলাইন উপকেন্দ্র নির্মাণ, পিয়ারাপুর ও চেউয়াখালী সেতু, মজুচৌধুরীর হাট এলাকায় নৌবন্দর, পৌর আধুনিক বিপণি বিতান রামগঞ্জে আনসার ও ভিডিপি ব্যাটালিয়ন সদর দফতর কমপ্লেক্স ভবন, লক্ষ্মীপুর পৌর আজিমশাহ হকার্স মার্কেট, লক্ষ্মীপুর সরকারী কলেজ একাডেমিক ভবন কাম পরীক্ষা কেন্দ্র, পুলিশ লাইন্স মহিলা ব্যারাক নির্মাণ, শহর সংযোগ সড়কে সেতু নির্মাণ, রায়পুর ও কমলনগরে ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স স্টেশনের ভিত্তিপ্রস্তর। তিনি দেশের অব্যাহত উন্নয়নের ধারা অব্যাহত রাখার জন্য দেশের মানুষকে আগুন সন্ত্রাস ও জঙ্গীবাদী বিএনপি জামায়াতকে পরিহার করে নৌকা প্রতীক প্রার্থীদের আগামী নির্বাচন সমূহ বিজয়ী করার আহ্বান জানান।

– See more at: https://www.dailyjanakantha.com/details/article/255337/%E0%A6%A8%E0%A7%8C%E0%A6%95%E0%A6%BE-%E0%A6%AE%E0%A6%BE%E0%A6%A8%E0%A7%81%E0%A6%B7%E0%A6%95%E0%A7%87-%E0%A6%B0%E0%A6%95%E0%A7%8D%E0%A6%B7%E0%A6%BE-%E0%A6%95%E0%A6%B0%E0%A7%87#sthash.EvNtozQq.dpuf

About The Author

Related posts

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *